অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবচ্ছেদ

অপরাধ দমন কিংবা নির্মূল করার ক্ষেত্রে শাস্তির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু কিংবা আদৌ শাস্তি অন্যতম পাথেয় কিনা তা অবশ্যই একটা বিতর্কের বিষয়। যদি ধরেও নেই, রাষ্ট্র শুধুমাত্র শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেই অপরাধ দমন করতে চায়, সেক্ষেত্রে শাস্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে সবার প্রথমে উপলব্ধিতে এ আনতে হবে। শাস্তিবিদ্যা আমাদের শাস্তির বিভিন্ন দর্শন বা মতবাদ সম্পর্কে পরিচিত করায়, যেগুলোর মূল বার্তা আমাদের শাস্তির প্রয়োজনীয়তা, উদ্দেশ্য, যথার্থতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে। আমরা কোন মারাত্মক অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় হরহামেশাই বলে থাকি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যাপারটা মূলত শাস্তিবিদ্যার নিবারনমূলক মতবাদ আলোচনা করে। নিবারনমূলক মতবাদ বলে, সমাজে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলে, আমাদের প্রধানত তিনটি বিষয় কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত যেকোন অপরাধ সংঘটনের পরে তার উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে অবশ্যই শাস্তির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে (certainty) অর্থাৎ আপনি অপরাধ করলে অবশ্যই আপনাকে রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আসতে হবে, এই বোধটুকুর সঞ্চার ঘটাতে হবে। এখানে রাষ্ট্র তার জনগন কে এই বার্তা দিবে যে, অপরাধ করে তুমি কোনভাবেই পার পাবে না, বরং এর বিনিময়ে তোমাকে অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা হবে। দ্বিতীয়ত শাস্তির মাত্রা হবে ততটুকু পরিমান যতটুকু কার্যকর করলে ঐ ব্যক্তি আর দ্বিতীয় বার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে লিপ্ত করার সাহস পাবে না, এমনকি ঐ মাত্রার শাস্তি সবার জন্য বার্তা হয়ে, সমাজের অন্যান্য উদিয়মান অপরাধীদের অপরাধ কর্মকাণ্ড করা থেকে অনুৎসাহিত করবে(severity)। তৃতীয়ত অপরাধ কর্মকাণ্ড সংঘটনের পর যতদ্রুত সম্ভব অপরাধী কে শাস্তির আওতায় আনতে হবে(celerity)। অর্থাৎ একটি অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধের স্বীকার ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট জনসাধারণের মধ্যে উক্ত অপরাধের ভয়াবহতার রেশ কাটার পূর্বেই অপরাধীর জন্য শাস্তি ভোগ করা নিশ্চিত করতে হবে।

এইবার যদি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে বের হয়ে এসে বাস্তবতার দিকে পা বাড়াই, আমরা আসলে কি দেখতে পাচ্ছি? আদৌ কি অপরাধের প্রতিক্রিয়া স্বরুপ আমাদের বিচার ব্যাবস্থার গৃহীত কর্মকাণ্ডের সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কায়েমের যে তরিকাগুলো আছে, তার কোন সাদৃশ্যতা খুঁজে পাচ্ছি? আমার মনে হয় না, অথচ আমরা কিন্তু প্রতিনিয়ত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে যাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণ মূলক মুক্ত পান্ডিত্যে উদ্ভুত ঘটনার গরম খবরে নিজেদের কে উষ্ণ করে চলেছি ঠিকই, কিন্তু নতুন ঘটনার আবিভার্বে আমারা পূর্ববর্তী ঘটনার ভয়াবহতাকে বেমালুম ভুলে যাচ্ছি কিংবা আমাদের ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া মারফত বিচার ব্যাবস্থার আনুষ্ঠানিকতায় চার্জশিট দাখিল, চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহন, জামিন মঞ্জুর নামঞ্জুর, রায়ের শুনানি, নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আলাদাত, আপিলের শুনানি হয়ে কোন একদিন হয়ত অপরাধী শাস্তি ভোগ নিশ্চিতকরণের খবর আমরা জানতে পারি, কিন্তু ততদিনে অপরাধীর শাস্তিভোগের কারন, অপরাধীর উক্ত অপরাধের মাত্রা, বিষয়বস্তু, ভয়াবহতা আর আমাদের চৈতন্যে থাকে না। পরিনামে রাষ্ট্র যদিও অপরাধের জন্য অপরাধীর সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট, প্রতিপত্তি উপেক্ষা করে শাস্তির বিধান নিশ্চিত করল কিন্তু তারপরেও এই শাস্তি কোন ভাবেই সমাজে দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো না।

এবার কিছু আলোচিত হত্যাকান্ডের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হুমায়ূন আজাদ হত্যাকান্ড, ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সংঘটিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ব্লগার রাজিব হায়দার হত্যাকান্ড, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ড এবং সর্বশেষ ২৬ জুন ২০১৯, বরগুনা শহরের কলেজ রোড এলাকায় প্রকাশ্যে রিফাত শরিফকে কুপিয়ে হত্যা। উল্লেখিত অপরাধগুলোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও অপরাধীদের অপরাধ সংঘটিত করার ধরন বা মোডাস অপারেন্ডি একই রকম অর্থাৎ একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। এই প্রত্যেকটি অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় মামলা হলেও আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোন একটি মামলারও সুরাহা এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভাবে হয়নি অর্থাৎ রাষ্ট্র দৃশ্যত উল্লেখিত অপরাধগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কোন অপরাধীরই শাস্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে নি। তাহলে আদৌ কি আমাদের ব্যানার হাতে, মানববন্ধনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলা দাবি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে? উত্তর হলো, স্রেফ না। এর পরিনামে রাষ্ট্রযন্ত্র নতুন এক সংকটের সম্মুখীন হতে চলেছে আর তা হলো ডার্ক জাস্টিস। সাধারণ মানুষ এখন ক্রস ফায়ারের মত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোকে যৌক্তিক বলে মনে প্রানে লালন করছে। মানুষ এখন নিজ উদ্যোগে গ্রিক পুরানের হারকিউলিস চরিত্রে আবির্ভূত হয়ে অপরাধীর বিচারের দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিয়েছে, এমনকি জনসাধারণের ব্যাপক সাড়া, সমর্থন সমাজে আরো অনেক হারকিউলিস তৈরি হওয়ার পেছনে প্রণোদনা যোগাচ্ছে। সুতরাং এই নব্য সংকট থেকে উত্তরনের জন্যে, অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কিংবা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার স্বার্থে হলেও, রাষ্ট্র কে অবশ্যই সত্যিকার ভাবেই অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আয়োজন করতে হবে।

পোস্টটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।