নিরুপমা

0
159

বাজার হাতে বাসায় ফিরলেন সমরেশ বাবু। কোনমতে বাজারের ব্যাগটা হাত থেকে রেখেই ডাক দিতে লাগলেন মেয়েকে।

সমরেশ বাবুর দুই মেয়ে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আর এই ছোট মেয়েটাই এখন ওনার সবচাইতে কাছের। নিজের কোন ছেলে সন্তান না থাকলে ও এই মেয়েটাকেই তিনি তার ছেলে মনে করেন। সুখে দূঃখে এই মেয়েটাই ওনার ভরসা।

আজ সমরেশ বাবু কে খুব উৎসাহী দেখাচ্ছে। উৎসাহের কারণ ও আছে। শিবপাড়া থেকে ওনার এক পরিচিত মহিলা তার মেয়েকে চাঁদনীর কাছে পড়াতে চান, এই খবর টা  এই খবর টা চাঁদনী কে দিতেই তিনি এতো উৎসাহী।

এমনিতেই সমরেশ বাবু খুব আবেগপ্রবণ এবং উৎসাহী মানুষ। যেকোন কিছু নিয়েই তিনি একটুতে কাঁদেন, একটুতে হাসেন। রসিকতায় ও ওনার জুড়ি ভার। চাঁদনীর পড়ালেখা, চাকরি, বিয়ে যেকোন বিষয়ের আলোচনা হলেই তিনি অত্যন্ত উৎসাহী হয়ে পড়েন। আজকে ও ঠিক তাই।

অবশ্য পেশা হিসেবে টিউশনির ব্যাপার টা চাঁদনীর অতোটা পছন্দ না হলেও তাকে রাজি করানো যাবে বলে সমরেশ বাবু বিশ্বাসী কারণ­- মেয়েটা ঠিক বাবার মতোই হয়েছে। উনাকে খুবই ভালবাসে। চাকুরি জীবনে নিজে শিক্ষক থাকায় শিক্ষকতা পেশার প্রতি উনার খুব দূর্বলতা। শিক্ষকতা কে তিনি কোন চাকরি মনে করেন না কারণ- তার কাছে এই সেবা বা বিনিময় কে কোন পারিশ্রমিক বা মূল্য দিয়ে তুলনা করা যায় না।

চাঁদনী বলে ডাকতে ডাকতে চাঁদনীর রুমেই চলে গেলেন তিনি। গিয়ে দেখেন চাঁদনী জানালার কাছে রোদে শরীর দিয়ে বসে আছে।

-কি গো মা! কই তুমি? কখন থেকে ডাকছি তোমায়! জবাব না পেয়ে ভাবছিলাম তুমি বোধ হয় ঘরেই নেই!

চাঁদনী ঘরেই আছে। সে তার রুমের জানালার কাছে রোদে শরীর দিয়ে বসে আছে কিন্তু ইচ্ছা করেই জবাব দিচ্ছিল না সে। তার পিরিয়ড হয়েছে সকালে। পিরিয়ড কালীন ব্যাথা তাকে খুব যন্ত্রণা দেয় তখন সে কারো সাথে কথা বলতে চায় না। রোদের তাপ টা তখন তার শরীরের চাহিদা থাকে, এতে সে কিছুটা আরাম বোধ করে। তাই সে শরীরে রোদ লাগিয়ে নিরবে বসে থাকে সে আর চোখ দিয়ে শুধু পানি বেয়ে পড়তে থাকে ব্যাথায়।

ব্যাথা সহ্য করে চুপ হয়ে থাকার এই ক্ষমতা টা চাঁদনীর অসীম। হোক সেটা শারিরিক অথবা মানসিক। মুখ বুজে সহ্য করে যায়।

বাবার উৎসাহী চেহারা চেহারা দেখে সে খুব একটা অবাক নয়। সে জানে বাবার এই উৎসাহের কারণ। নিশ্চই তিনি নতুন কোন বিয়ের প্রস্তাব বা চাকরির খবর নিয়ে এসেছেন। এটা তার জন্য খুবই পরিচিত একটা চেহারা।

আড়ালে চোখের কোণায় জমে থাকা পানি মুছে সে বলল-

-বসো বাবা। কেন ডাকছিলে?

সমরেশ বাবু খুব আনন্দের সাথে হাসিমুখে বললেন

-মা তোমার জন্য একটা টিউশনী আছে। একটা মেয়েকে পড়াতে হবে। মেয়ের মা আমার খুব পরিচিত।

টিউশনীর কথা শুনেই চাঁদনীর অশান্তি বাড়তে লাগল। এই অবস্থায় এই ব্যাপারে কথা বলতে একদম ভাল লাগছে না তার। তবুও বাবার এই হাসিমাখা চেহারা অমলিন রাখতে একটু কথা বলল সে।

-বাবা তুমি কি মহিলা কে কথা দিয়ে এসেছো?

-না গো মা। আমি কথা দেই নি, তুমিই সিদ্ধান্ত জানাবে। ওনার নাম্বার এনেছি। তুমি ফোন করে কথা বলে নিও।

-আচ্ছা বাবা। ওনারা কোথায় থাকেন?

-এইতো “শিবপাড়া”।

শিবপাড়া’র কথা শুনে চাঁদনী একটু পজেটিভ হল। শিবপাড়া ভাল এলাকা। উনারা ভাল এলাকার বাসিন্দা, তাই। তাছাড়া ওখান থেকে তাদের বাসায় যাওয়া-আসা করাটাও একটু সুবিধার।

দু-দিন পর চাঁদনী ফোন করল মহিলাকে।

ওপাশ থেকে……

– হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম।

-হ্যালো, আমি চাঁদনী বলছিলাম। আমার বাবার কাছে মনে হয় আপনি আপনার মেয়েকে প্রাইভেট পড়ানোর ব্যাপারে বলেছিলেন।

-ওহহো! জ্বি জ্বি। আপনি উনার মেয়ে মেয়ে তাই না? কেমন আছেন?

-এইতো ভাল আছি। আপনি ভাল আছেন?

-জ্বি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনার বাবার সাথে আমার অনেক দিনের পরিচয়। আমার বড় চাচার সাথে উনার বন্ধুত্ব আছে।

-ও আচ্ছা… আপনার মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে?

-জ্বি… ক্লাস থ্রী তে পড়ে। সে খুব ভাল ছাত্রী। আপনি নির্ধিদ্বায় তাকে পড়াতে পারেন।

-হুমম! ঠিক আছে আপা, আপনি  তাহলে আগামীকাল বিকালে তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসেন। কথা হোক, আর বিকাল বেলাতেই আমি পড়াতে পছন্দ করব।

-হয়েছে কি ম্যাডাম… আমার তো ছোট পরিবার, বাসায় কেউ থাকে না। তাছাড়া সব কাজ আমাকেই করতে হয়। তাই বলছিলাম যে, আপনাকেই আমাদের বাসায় এসে পড়াতে হবে।

এই প্রস্তাবটি চাঁদনীর ভাল লাগল না। একজন মেয়ে হিসেবে বাসায় গিয়ে পড়ানোটা তার কাছে খুবই বিরক্তিকর। সে জানে মেয়েদের বাসায় গিয়ে টিউশনী করতে গেলে অনেক ঝামেলা।

-আমি বাসায় গিয়ে পড়াতে পারব না আপা। বাসায় পুরুষ’রা থাকেন। আমি তাতে একদম কমফোর্ট ফিল করি না।

-না না… সেটা আমি বুঝতে পারি। আমি, আমার স্বামী আর আমাদের মেয়ে ছাড়া পরিবারে আর কেউ নেই আমাদের। আর আমার স্বামী প্রায় সারাদিনই বাসায় থাকেন না। রাতে ফেরেন। উনি বিকালেও বাসায় থাকেন না। আপনি তখন-ই এসে পড়াতে পারবেন।

-আপনি কি শিওর উনি বিকালে বাসায় থাকবেন না?

-হ্যাঁ হ্যাঁ।

-আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে।

চাঁদনীর ইচ্ছা হচ্ছিল না তবুও ওনারা শিবপাড়ার বাসিন্দা বলে রাজি হল সে। শিবপাড়া খুব গোছালো এলাকা। ওরা আগে শিবপাড়াতেই ভাড়া বাসায় থাকতো, পরে ওখান থেকে চলে আসে।

 

————————

 

টিউশনির প্রথম দিন মহিলার সাথে চাঁদনীর পরিচয় হল। মহিলার নাম রুকসানা। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ, উচ্চতা আর চেহারার গঠন ঠিকঠাক।

চাঁদনী দেখল রুকসানা আপা ঠিকই বলেছেন । বাসায় আর কারোর উপস্থিতি নেই বলেই মনে হচ্ছে। তিনি তার কথা রেখেছেন। তার স্বামী বাসায় নেই। ওনার মেয়ের সাথেও দেখা হল। মেয়েকে রুকসানা বললেন – উনি তোমার নতুন প্রাইভেট টিচার। তোমাকে বাসায় পড়াবেন। টিচারকে সালাম দাও…

-আসসালামুয়ালাইকুম টিচার।

চাঁদনী জবাবে কি বলবে বুঝতে পারছে না। তারপরে ও সে অনেক চেষ্টায় বলল

-ওলাইকুমসালাম।

চাঁদনী চিন্তা করল এভাবে ভুল উচ্চারন করাটা হয়তো ঠিক হয়নি। তার থেকে বরং নমষ্কার দিলেই ভাল হতো। সে যেমন তার ধর্ম শিক্ষা অনুযায়ী আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে আমার ও উচিত আমার ধর্মশিক্ষা অনুযায়ী তাকে অভ্যর্থনা জানানো। এতে করে আমাকে ও তার টা শিখতে হবে না আর ভুল উচ্চারণ ও করতে হবে না।

এই বিষয় টা সে সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা তে পড়েছে। ফেলুদা চরিত্রের প্রদ্যোসচন্দ্র মিত্র অন্য ধর্মের কারোর সাথে দেখা হলে তাদের সালাম এর জবাবে নমষ্কার দিতো। এখন থেকে চাঁদনী ও এটার ওভ্যাস করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

-তোমার নাম কি মা মণি?

মেয়েটি উত্তর দিচ্ছে না। সে তার মায়ের  দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। বোধ হয় লজ্জা পাচ্ছে।

রুকসানা তার মেয়েকে বললেন- বলো মা। তোমার নাম বলো টিচারকে…

মেয়েটি তাও কিছু বলল না। সে তার জ্বিহবা বের করে পরনের  ফ্রগের বাম পাশটাকে হাত দিয়ে হালকা তুলে ধরে এমন একটা ভঙ্গি করল যেন সে লজ্জায় কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে।

বাচ্চারা এমনই হয়। কারোর সাথে প্রথমে মিশতে একটু সময় নেয় তবে একবার মিশে গেলে তারপর তারা তাদের ভিতরের জাগ্রত মানুষের পরিচয় দেয়।

চাঁদনী বলল- মা মণি তোমার কয়টি নাম? একটি নাকি দুইটি? জানো? আমার বাবা আমাকে আদর করে দুইটি নাম দিয়েছেন।

মেয়েটি জ্বিহবা বাইরে রেখেই দুইটি আঙ্গুল দেখিয়ে বলল- আমার দুইটি নাম।

-তাই নাকি? বাহ! কোন নামটি তোমার বেশি পছন্দের?

-কেয়া।

-ও মা! কি সুন্দর নাম! কেয়াআআআআ!! আমারও নামটি খুব পছন্দ হয়েছে। এতো সুন্দর নামটি কে রেখেছে গো?

-নাজুনি।

নাজুনি হচ্ছে আনাদের কাজের মহিলা। আসলে ওর নাম নাজনিন। কেয়া’র জন্মের কিছুদিন আগে থেকে নাজনিন এ বাসায় কাজ করতো। কেয়া কে খুব ভালবাসতো। ওর আদর যত্নেই বেড়ে উঠেছে কেয়া। ছোটবেলা থেকেই কেয়া তাকে নাজুনি বলে ডাকে। (রুকসানা বললেন)।

-ও আচ্ছা। উনি কোথায়?

-কি জানি? গত ছয় মাস আগে হঠাৎ করে বাসা ছেড়ে চলে গেছে!

-সে কি! আপনারা খোঁজ নেন-নি তার?

-নিয়েছি। কেয়া’র আব্বু অনেক খোঁজ করে জানতে পেরেছেন সে নাকি কোন এক লোক মারফতে সৌদি আরবে চলে গেছে গৃহকর্মীর কাজ করতে। তার বাড়ি থেকেও নাকি এই খবর পাওয়া গেছে।

-আই সি! এভাবে না বলে যাওয়া টা তো ওনার ঠিক হয় নি।

-হুমম…

চাঁদনী লক্ষ্য করল কেয়া হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে কথা শুনছে।

-কেয়া… তোমার সুন্দর নামটা তো কেয়া তাই না?

-জ্বি টিচার।

-কিন্তু তুমি তোমার স্কুলের খাতায় কি লিখ?

-ইয়াসমিন আক্তার কেয়া

-খুব সুন্দর নাম! চলো এবার আমরা পড়তে বসি…

রকসানা ম্যাডামের জন্য চা বানাতে রান্নাঘরে গেলেন। চা বানাতে বানাতে ভাবতে লাগলেন- এই মেয়েটি এতো সুন্দর কেন? কার মতো যেন একটা দেখতে! তিনি খানিক চিন্তা করে বের করলেন মেয়েটিকে দেখতে ঠিক যেন এক দেবীর মতো। হিন্দুদের দূর্গা পূজায় যে প্রতিমা তৈরী হয় সেই প্রতিমার মতো চেহারা।

সুন্দরীদের দেমাগ থাকে। কিন্তু এই মেটির আচার-ব্যাবহারে তা একদম-ই বুঝা যায় নি।

যাক, কেয়া’র জন্য ভাল একজন টিচার পাওয়া গেল। এমনিতেই কেয়া কে নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত।  নাজনিন টা হঠাৎ করে এভাবে চলে গেল! আর কোন কাজের মহিলা ও পাওয়া যাচ্ছে না সুবিধামতো। নাজনিন চলে যাওয়ার পর থেকে কেয়া কে সামলাতে ওনার খুব কষ্ট হচ্ছে, সে থাকতে কেয়া’র লালন-পালন নিয়ে কোন চিন্তাই কোন চিন্তাই ছিল না তার।

 

———————–

 

টিউশনী শেষ করে বের হতে সন্ধ্যা হয়ে গেল চাঁদনীর । চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। এমনিতেই একা পথ চলতে চাঁদনী খুব ভয় পায় তার উপর আবার সন্ধ্যাবেলা। দিন্র দিনে বাসায় ফিরতে পারলে খুব ভাল হতো, চেষ্টাও করেছিল সে কিন্তু টিউশনীর প্রথমদিন বলে পেরে উঠে নি। পরিচয় পর্বে অনেক সময় লেগে যায়।

সমরেশ বাবু খুব চিন্তিত হয়ে আছেন মেয়ের জন্য। মেয়েকে ফোন ও করেছেন দু-বার। দু বার-ই চাঁদনীর উত্তর- আসছি বাবা, তুমি চিন্তা করো না।

চিন্তা না করে কি থাকা যায়? রাত হয়ে গেল প্রায়, ঘরে বৃদ্ধ বাবা আর মেয়ে একা বাইরে! বাসায় নিয়ে আসার মতো ও কেউ নেই। এসব চিন্তা করতে করতেই ঘরে এসে ঢুকল চাঁদনী।

-এসেছো মা! চিন্তা হচ্ছিল তোমার জন্য।

(সমরেশ বাবু তার মেয়েদেরকে কখনও তুমি ছাড়া বলেন না। আসলে, শুধু মেয়েদেরকে নয়, কাউকেই তিনি সহজে আপনি/তুমি ছাড়া কখনও তুই করে বলেন না।)

চাঁদনী দেখল বাবার মুখখানা চিন্তামুক্ত হয়েছে, এবার আবার সেই উৎসাহী চেহারা। সে জানে বাবা এবার তার টিউশনীর ব্যাপারে জানতে উৎসুক।

-বাবা তুমি আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করো কেন?

-করব না? তুমি বুঝবে না গো মা। মেয়ের বাবা হলে চিন্তা থাকবেই। তা বলো, কেমন গেল তোমার টিউশনীর প্রথম দিন? ওদেরকে পছন্দ হয়েছে তো?

-হ্যাঁ বাবা। হয়েছে। ওনার মেয়েকে আমার খুব ভাল লেগেছে। প্রথমে সে খুব লজ্জা পেলেও পরে আমার সাথে একদম মিশে গেছে। তার ভিতরে অনেক প্রতিভা আছে বাবা। জানো আজ কি করেছে?

-কি?

-ও কে লিখতে দিয়েছিলাম। লিখার এক পর্যায়ে দেখি সে দুই হাত দিয়েই সমান তালে লিখতে পারে।

-তাই নাকি?( সমরেশ বাবু অনেকটা অবাক হয়ে)

-হ্যাঁ বাবা। পড়াটা ও সহজেই মুখস্থ করতে পারে।

-বাহ! বাহ! ভাল-ই হল। তোমার তাহলে ভাল-ই লাগছে।

-এখন পর্যন্ত তো সব ঠিকঠাক।

 

———————-

 

বাইরে আজ খুব ঠান্ডা। শৈতপ্রবাহ শুরু হয়েছে। একে তো ঠান্ডা তার উপর আবার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরছে! এ বছর যেমন গরম পরেছে তেমনি শীত। পৃথিবীর জলবায়ু যে দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

চাঁদনী আজ ভার্সিটিতে যাবে। বাইরে আজ রিকসা পাবে কি না সেই চিন্তায় অস্থির। অবশ্য একটা রিকসা ও যদি খালি পেয়ে যায় তাহলেই হবে কারণ সে জানে, রিকসা চালকরা কখনো তাকে মানা করে না। এই বিষয় টা চাঁদনী কলেজ জীবন থেকে লক্ষ্য করেছে।

কোচিং থেকে আসার সময় তার সামনেই তার ছেলে ক্লাসমেটরা রিকসা ডাক দিলে রিকসাচালক মানা করে দিতো কিন্তু ঐ একই রিকসা চালক কে চাঁদনী যখন ডাকতো তখন ঐ একই যায়গায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতো। ভাড়া একটু কম দিলেও রাজি। চাঁদনী বিষয় টা খুব উপভোগ করতো, খুব মজা পেতো। সে ভাবতো – এই জগতের পুরুষরা নারীদের প্রতি এতো দূর্বল কেন? আর এতো দূর্বলতা নিয়ে তারা আবার এই নারীদের উপরেই হাত তোলে কিভাবে? তখন তারা কি করে এতো কঠন হয়?

এই রিকসা চালক ও হয়তো এমন । বাইরে নারীদের প্রতি তার এতো দূর্বলতা কিন্তু ঘরে গিয়ে হয়তো তার নিজের বউয়ের প্রতি-ই তার অবস্থান কঠোর।

চাঁদনী একটা চাকরীর প্রয়োজনে অনার্সের প্রসংশা পত্র আনতে ভার্সিটিতে যাবে। তার ক্লাসমেট বান্ধবী অন্তরা কে বলে রেখেছে ভার্সিটি গেটে থাকতে। তার জন্য অপেক্ষা করতে। তারা দুজনে একসাথেই প্রশংসা পত্র আনবে। চাঁদনী কে রেখে যেন সে কোনভাবেই ভিতরে চলে না যায় সেই হুশিয়ারি ও দিয়ে রেখেছে অন্তরাকে।

চাঁদনী কখনও ভার্সিটিতে একা বিচরণ করতে পারে না। পুরোটা ভার্সিটি লাইফ সে এভাবেই অন্তরা কে সাথে নিয়ে কাটিয়েছে। তার অতীত অভিজ্ঞতাগুলো কোনভাবেই তাকে একা চলার সাহস জোগাতে দেয় না। কলেজ আর কোচিং জীবনে দুটি ছেলের উত্যক্ততার কারণে প্রায় ১ মাস সে কলেজেই যায় নি। একটা সময় পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে কিন্তু মায়ের মতো তার বড় বোনটি তাকে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরনা জোগানোর কারণে আজ চাঁদনী গ্রাজুয়েট। সেই থেকে সহ্য ক্ষমতা দিন দিন আরো বেড়ে চলেছে চাঁদনীর তবে সাহস বাড়ে নি।

 

——————————

 

প্রশংসা পত্র নেয়ার কাজ শেষ করে ডিপার্ট্মেন্ট থেকে বের হইয়ে যাচ্ছিল চাঁদনী আর অন্তরা। হঠাৎ টিচার্স রুমের ভিতর থেকে এই মেয়ে বলে ডাক দিলেন প্রফেসর জনাব মহিউদ্দিন। ভার্সিটিতে উনাকে সবাই মহি স্যার বলেই ডাকে। মহি স্যার হচ্ছেন এই ডিপার্টমেন্টের সবচাইতে রাগী স্যার। রাগী স্যারকে সবাই ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক তবে স্যারকে কেউ-ই তেমন একটা ভয় পায় না। তার কারণ হল- ছাত্র/ছাত্রীদের প্রতি স্যারের আন্তরিকতা এবং ভালবাসা। বয়স হওয়ার সাথে সাথে স্যারের রাগটাও কমে যাচ্ছে তবে এই বয়সের ভীড়ে কারোর নাম ভুলে গেলেও সব ছাত্র-ছাত্রীদের চেহারা ওনার মেমোরিতে স্ক্যান করা থাকে। দেখলেই চিনতে পারেন।

মহি স্যারের ডাকা দেখে চাঁদনী অন্তরাকে বলছে তোকে ডাকছে আবার অন্তরা চাঁদনীকে বলছে তোকে ডাকছে। এভাবে করতে করতে পরে দুজনে একসাথেই টিচার্স রুমের দরজার পাশে গিয়ে দাড়াল।

-গুড আফটারনুন স্যার। ভাল আছেন?

-গুড আফটারনুন। ভাল নাই। ঠান্ডা লেগে অবস্থা খারাপ। গলা বসে গেছে। আয়। ভেতরে আয়।

গলায় ঠান্ডা লাগা স্যারের অনেক পুরোনো রোগ। শীত আসলে স্যারের গলায় সবসময় মাফলার থাকবেই। আর সাথে একটা মাস্ক। সেটা অবশ্য গরম দিনেও থাকে। মাস্ক ছাড়া স্যারকে খুব কম-ই দেখা যেতো। সাইনাস এর সমস্যার কারণে স্যারের এই মাস্ক নিরাপত্তা। নতুন ছাত্র-ছাত্রী যারা স্যারকে মাস্ক ছাড়া কখনও দেখে নি তারা বাজি লাগাতো যে- স্যারের গোঁফ আছে কি নেই!

আসলে স্যারের গোঁফ নেই। তবে চাঁদনী মনে করে স্যারের গোঁফ রাখা উচিৎ ছিল কারণ- রাগী লোকেদের গোঁফ থাকলে তাদের রাগ ভাল প্রকাশ পায়।

সবসময় মাস্ক পরে থাকতেন বলে এই ভার্সিটিতে স্যারের আরেকটি গোপন নাম হল- মাস্ক ম্যান।

টিচার্স রুমের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে দুজনে একসাথে বলল

-হ্যাঁ স্যার আজ প্রচন্ড ঠান্ডা।

-হুমম। তোরা কি কাগজপত্র কিছু নিতে এসেছিস নাকি?

-হ্যাঁ স্যার । (আবারো দুজনে একসাথে)

-ভাল। গ্র্যাজুয়েট তো হয়ে গেলি। এবারে কি করবি? চাকরী নাকি বিয়ে? নাকি দুটোই হয়ে গেছে কে জানে?

চাঁদনী একটু হাসিমুখ করে উত্তর দিলঃ

-না স্যার। কোনটাই হয় নি।

-আরে হয়ে গেলেই বা কি? কতো ছাত্র-ছাত্রী এলো-গেল, চাকরী হল, বিয়ে করল, অনেকে স্কলারশীপও পেল। মিষ্টি খাওয়াবে তো দূরের কথা, এসে সালাম করে সুসংবাদ টা পর্যন্ত দিয়ে যায় না।

চাঁদনী চিন্তা করে দেখল এই কথাগুলো সে আরো কোথাও জানি শুনেছে। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। চাঁদনী যে প্রাইমারি স্কুলে পড়ছিল সেই স্কুলের অপর্না ম্যাডাম ও কোথাও দেখা হলেই ঠিক এই কথাটি বলতেন।

-স্যার, আমরা ওরকম না স্যার। আমাদের কোন সুসংবাদ হলে সবার আগে আপনাকে জানাবো। আপনার আশির্বাদ নিয়ে যাব স্যার অবশ্যই। (কথাটা সত্য বলল কি না বুঝতে পারছে না চাঁদনী কারণ- অপর্না ম্যাডামকে ও সে একই কথা বলেছিল কিন্তু ভাল ভার্সিটিতে চান্স পেয়েও শিক্ষাজীবনের প্রয়হম শিক্ষিকাকে জানানো বা ওনার আশির্বাদ নেয়া হয়নি কখনও।)

মহি স্যার চাঁদনীর কথাটাকে নিছক তুলনা করার মত করে একটা হাসি দিয়ে বললেন

-বাদ দে ওসব। তোরা বড় হবি, সফল হবি, আমি সবাইকে আঙুল দেখিয়ে বলতে পারলেই হল- ঐ যে, সে আমার স্টুডেন্ট ছিল। এতেই আমার তৃপ্তি। আশির্বাদ তোদের জন্য সব সময়েই আছে, থাকবে। চাকরি জীবন তো প্রায় শেষ করেই ফেললাম, এতোগুলো ব্যাচ এতোগুলো ছাত্র-ছাত্রী, এতোগুলো সহকর্মী নিয়ে কাজ করেছি যে- মানুষ নিয়ে একটা ভাল গবেষণা হয়ে গেছে বলা যায়। কার মন কেমন? কে কি ভাবছে? কে কি করবে? সব বুঝতে পারি। এই যে তোরা হয়তো এখন ভাবছিস এই বুড়ো লোকটা এখন ক্লাসের লেকচার শুরু করে দিল নাকি?

দুজনে একসাথে – না না স্যার! কি বলছেন! (অন্তরা অবশ্য একটু লজা পেল। কারণ সে আসলেই ঠিক এটাই ভাবছিল।)

মহি স্যার আবারো আগের মতো একটা হাসি দিয়ে বললেন

-একটা কথা শিখেছি এ জীবনে। কি জানিস?

-কি স্যার?

-পৃথিবীতে সবচাইতে কঠিন কাজ হচ্ছে মানুষ নিয়ে কাজ করা আর সবচাইতে সহজ কাজটাও হচ্ছে মানুষ নিয়ে কাজ করা। আর তাই আমার প্রতি মানুষের সব ধরনের ব্যাবহারকে আমি স্বাভাবিক বলেই মনে করি।

 

—————————————

 

কেয়া একটু একটু করে টিচারের সাথে অনেকটা মিশে গেছে। এই মেয়ের দুই হাত দিয়ে লিখতে পারার ক্ষমতা চাঁদনীকে আশ্চর্য করে তোলে। কিভাবে পারে মেয়েটা? সমানতালে  দুই হাত দিয়ে লিখতে পারার এমন ক্ষমতা সে কখনও দেখে নি তবে অনেক প্রতিবন্ধিদেরকে দেখেছে যারা মুখ বা পাঁ দিয়ে লিখতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছে কিন্তু কেয়া’র এতো ছোট বয়সে এই প্রতিভা আসলেই অবাক করার মতো। চাঁদনী কেয়া’র এই প্রতিভার কথা অন্তরাকে ও বলেছে। অন্তরা এটি দেখার খুব আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সপ্তাহে তিন দিন করে পড়াতে হয় কেয়া’কে কিন্তু চাঁদনীর ইচ্ছা করে সে প্রতিদিনই কেয়া’কে পড়াতে যাক। অনার্স শেষ করেছে, চাকরী এখনো ধরা হয়নি। অবসর সময় কাটে তার আর কেয়া’র সাথে সময় কাটাতে ও তার খুব ভাল লাগে। তাই সে গত দুই সপ্তাহে ইচ্ছা করেই কেয়া’কে চার দিন করে পড়িয়েছে।

আজ কেয়া’দের বাসায় ঢুকার সময় একজন লোক টাডেড় বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। সাথে কেয়া’র মা ও দাঁড়িয়ে বিদায় দিচ্ছিলেন। চাঁদনীকে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটি। ঘর থেকে বের ও হচ্ছে না আবার ভিতরে ও ঢুকছে না এমন একটা অবস্থায় দরজায় দাড়িয়ে ফেলফেলিয়ে তাকিয়ে আছে চাঁদনীর দিকে। এই বিব্রতকর অবস্থায় চাঁদনী দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তখন রুকসানা বেগম লোকটাকে কেয়া’র বাবা জনাব মোতাহার হোসেন আর চাঁদনীকে কেয়া’র প্রাইভেট টিউটর হিসেবে দুজনার মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর লোকটি সরে দাড়ালে বাসায় ঢুকে সোজা কেয়া’র পড়ার রুমে চলে যায় চাঁদনী।

তার খারাপ লাগছে। কেয়ার বাবা তো এই সমইয়ে বাসায় থাকার কথা নয় তবে ভাগ্য ভাল যে উনি বের হয়ে যাচ্ছেন। বাসায় পুরুষ মানুষ থাকাটা স্বাভাবিক হলেও পুরুষ মানুষের উপস্থিতিতে টিউশন দেয়া চাঁদনীর অপছন্দ। কারণ- মজুমদার পাড়ার একটা টিউশনীতে ছাত্রীর চাচা প্রত্যেকদিন পড়ার রুমের পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে দেখতো। চাঁদনী পড়াতে গেলে লোকটি একবার হলেও পড়ার রুমে ঢুকবেই। আর রুমে ঢুকার জন্য তার একটাই বাহানা ছিল- সেই ছাত্রীর জন্য কোন না কোন চকলেট দিয়ে যাওয়া। যেন, ভাতিজির প্রতি সব আদর আর আহ্লাদ তার ওই পড়ানোর সময়টাতেই একদম বেঁয়ে পরতো। একদিন পর্দার আড়াল থেকে লোকটা তার মোবাইল দিয়ে চাঁদনীর ছবি তুলতে দেখে ফেলায় সেই টিউশনী ছাড়তে বাধ্য হয় সে। নতুবা সে টিউশনী টা ছাড়তো না। বাবার মতো “শিক্ষকতা” টা পেশা হিসেবে চাঁদনীর খুব পছন্দের।

 

————————

 

পড়ার রুমের দরজা জানালা বন্ধ। সম্ভবত ঠান্ডার কারণে। আজ একে তো ঠান্ডা তার উপর আবার মেঘলা আঁকাশ। ঘরে বিকাল বেলার কোন আলো-ই নেই। আলো বলতে ঘরের টিউব লাইট এর আলো। কেয়া পড়তে এসেছে। আজকে তাকে খুব মিষ্টি লাগছে দেখতে। তার লম্বা চুলে খুব সুন্দর করে দু পাশে দুটো বেণি বেঁধেছে। হাতে একটি কাঁচের জার। কাঁপড় দিয়ে ঢেকে এনেছে। জারটি পড়ার টেবিলের উপর রেখে চাঁদনীকে বলল- টিচার, আপনি লাইট টা একটু বন্ধ করুন না…

-কেন কেয়া? কি ব্যাপার? লাইট বন্ধ করতে হবে কেন?

-করুন না টিচার…

অন্ধকার চাঁদনী খুব ভয় পায়। তাদের দুই বোনেরই অন্ধকার খুব ভয় লাগে। রাত্রে ঘুমানোর সময় ও ভ্যে তারা ঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখে । তবুও কেয়া’র মিষ্টতার কাছে হার মেনে লাইট বন্ধ করল তবে মোবাইলের ডিসপ্লের আলো জ্বালিয়ে রাখল। কেয়া তখন কাঁচের জারের থেকে কাঁপড় সরালো। সুন্দর এক দৃশ্য দেখা গেল জারের ভেতর থাকা জোনাকির মিটমিট আলোয়। অন্ধকারে এই মিটমিট আলোয় দুজনে কথা বলছে;

-এগুলো তুমি কোথায় পেলে কেয়া?

-আম্মু এনেছে।

-কোথা থেকে?

-আমার নানু বাড়ি থেকে। আমার নানু বাড়িতে বড় একটি বাগান আছে সেখানে অনেক জোনাকি আসে। কাল রাত্রে মা নানু বাড়ি গিয়েছিল, আসার সময় সেখান নিয়ে এসেছে আমার জন্য।

-খুব সুন্দর! (চাঁদনী মুগ্ধ হয়ে জোনাকি দেখছে।)

-টিচার…

-হুমম??

-এই জোনাকিগুলো কিভাবে জ্বলে?

-ভাল প্রশ্ন করেছো কেয়া। এই জোনাকিদের দেহে লুসিফারিন নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন হয়, এটি বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে এই আলো তৈরী করে।

-ও আচ্ছা!! (কেয়া এমনভাবে ও আচ্ছা বলল যেন সব বুঝে গেছে।)

চাঁদনী একটু মুচকি হেসে বলল;

-জানো? আমাদের দেশে শুধু সবুজ আলোর জোনাকি দেখা যায় কিন্তু অন্যান্য দেশে লাল আলোর ও জোনাকি পাওয়া যায়।

কেয়া উৎফুল্ল হয়ে বলল;

-তাই নাকি টিচার? তাহলে আমি নাজুনী কে বলব আমার জন্য লাল আলোর জোনাকি নিয়ে আসতে।

-হাহাহা… ঠিক আছে। বলো। এখন চলতো পড়তে বসি। অনেক দিন পর আজকে জোনাকি দেখে ভালোই লাগছে।

কেয়া লাইট অন করল আর সাথে সাথেই সে ভয়ে আঁতকে উঠল! লাইট জ্বালানোর সাথে সাথেই রুমে এভাবে মোতাহার হোসেনের উপস্থিতি দেখে ভয় পেয়েছে সে। এই লোক এখানে এভাবে কেন এলো? কখন এলো? ওনার তো চলে যাওয়ার কথা ছিল তাহলে, গেলেন না কেন? এতো গুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে ঘুরতে নিজের প্রতি ও খুব রাগ হচ্ছিল চাঁদনীর।

সে জোনাকির প্রতি এতোটাই আনমনা হয়েছিল যে, একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ রুমে ঢুকল কিন্তু সে বুঝতেই পারল না!

মোতাহার হোসেন বললেন- আপনি কি ভয় পেয়ে গেলেন?

চাঁদনী কিছু বলছে না। বিরক্তিবোধের একটা চেহারা নিয়ে কেয়া কে বই বের করতে বলল সে। কেয়া বই বের করল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ও খুব বিরক্ত এ ঘটনায়। সে বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো জোরে জোরে শব্দ করে পাল্টাতে লাগল।

মোতাহার হোসেন কেয়া’র চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন;- ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি রুমে ঢুকে দেখি আপনি কেয়া কে কিছু একটা বুঝাচ্ছেন তাই আওয়াজ করি নি।

চাঁদনী এবারও কিছু বলছে না। সে ভাবছে- এই লোকটার কি কোন কমন্সেন্স নেই? অন্ধকারে এভাবে এসে রুমে ঢুকে পরল! ঘটনাটা একদম পছন্দ হয় নি চাঁদনীর। সে মোতাহার এর দিকে তাকাচ্ছেই না।

সাধারণত এরকম কোন ভয় পেলে সেটা কেটে উঠার পর বুকে থুথু দেয় সে কিন্তু এখন পারছে না। তার ভয় যেন কাটছেই না।

মোতাহার হোসেন বলতে লাগলেন;

-আপনাকে দেখে ভাবলাম ভাল করে পরিচয় হয়ে যাই। তাই আসা। (বলে হে হে হে করে হাসলেন মোতাহার।) আপনি কি স্টুডেন্ট?

কথা বলার ইচ্ছা না থাকা সত্বেও চাঁদনী বলল;

-হ্যাঁ

-কি সে পড়েন আপনি?

-গ্রাজুয়েট শেষ করেছি।

-ভাল ভাল।

চাঁদনী আর কথা বাড়াতে চাচ্ছে না। তাই সে কেয়া কে পড়া বুঝাতে লাগল।

মোথার নিজের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন;- ভাল করে পড়ো মা। বুঝেছো?

কেয়া ভ্রুক্ষেপ ও করল না।

মোতাহার রুম থেকে চলে গেলেন কিন্তু বাসা থেকে আর বের হন নি। তিনি তার নিজের রুমে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। কেয়া’র আম্মু কে ডেকে চা দিতে বললেন। রোকসানা চা দিয়ে গেলেন কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। ধূমপান করতে করতে মোতাহার কল্পনা করছেন কেয়া’র টিচারকে নিয়ে।

মোতাহার অনেক সুন্দরী মেয়েদের দেখেছেন কিন্তু এই মেয়েটি একদম ভিন্ন। তার সৌন্দর্য অনন্য। এই চেহারায় শুধু সৌন্দর্যতা প্রকাশ পায় না, সাথে আরো অনেক কিছু প্রকাশ পায়। তার মায়াবতী দুই চোখ খুব সহজেই যে কাউকে আকৃষ্ট করতে পারে। সে এতোটাই নিপুণ অপরুপা যে, মনে হচ্ছে কোন এক চিত্রশিল্পী তার মনের মাধুরী দিয়ে ইচ্ছেমতো রং তুলির ব্যাবহারে তার জীবনের সেরা একটি নারী চিত্রকর্ম এঁকেছেন।

যিনিই এই মেয়েটির নাম রেখেছেন তার নাম রাখা একদম পারফেক্ট হয়েছে। চাঁদনীইইই!! তার রুপের জ্যোতিতে চারিদিক জ্যোতির্ময় হওয়ার মতো অবস্থা!

তিনি আরেকটি সিগারেট ধরাতে ধরাতে গুনগুনিয়ে একটি হিন্দী গান গাইতে লাগলেন–

“কিতনা হাছিন চেহরা, কিতনি প্যায়ারি আঁখে, কিতনি প্যায়ারি আঁখে হো আঁখো সে ঝালাকতা প্যায়ার। কুদরাত নে বানায়া হোগা ফুরসাত সে তুঝে মেরে ইয়ার।”

 

————————–

 

সমরেশ বাবু অনেক সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেন। রাত্রে ঘুমান ও তাড়াতাড়ি। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তিনি হাঁটতে বের হোন। সকাল বেলার নাস্তায় ওনার পরিবারের পছন্দের খাবার হল- চিড়ার পোলাও অথবা দই চিড়া।

সমরেশ বাবুর মেয়েটা ও একদম তার মতোই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে। বাবার জন্য নাস্তা তৈরী করে। আজ বাসায় দই নেই। তাই চাঁদনী চিড়ার পোলাও তৈরী করেছে আর বাপ-বেটি একসাথে গল্প করে করে খাচ্ছে।

-চাঁদনী তুমি কি মাস্টার্স এখানেই করবে? নাকি ভার্সিটি চেইঞ্জ করার ইচ্ছা আছে?

-না বাবা। আমি এখানেই করব।

-এখানেই?

-হ্যাঁ বাবা। এখানেই করব। আমার ভার্সিটি চেইঞ্জ করার কোন ইচ্ছা নেই।

-খুব ভাল খুব ভাল। এখানেই ভাল হবে।

সমরেশ বাবু মেয়ের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকেন সবসময়। চাঁদনীর সব সিদ্ধান্ত অকপটে মেনে নেয়ার মধ্যে সমরেশ বাবুর মেয়ের প্রতি বিশ্বাস-ভালবাসা এবং নির্ভরযোগ্যতা কে প্রকাশ করেন।

-তা তোমার টিউশনি টা কেমন চলছে মা?

-ভাল চলছে বাবা। (চাঁদনী মিথ্যা বলেছে। গতকালকের পর থেকে তার একটু ও ভাল লাগছে না। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে টিউশনি টা ছেড়ে দিবে। তবে বাবাকে সত্যি টা বললে টেনশন করবে তাই সে বলে নি।)

-তোমার ছাত্রী…. কি জানি নাম! সে কেমন আছে?

-তার নাম কেয়া। ভালোই আছে।

-ও হ্যাঁ। কেয়া। নতুন কোন প্রতিভা পেলে তার?? (কথাটি বলে হাসলেন সমরেশ বাবু।)

-বাবা শুনো…. কেয়া’র অনেক গুণ আছে। আর শুধু কেয়া বলেই নয় সব বাচ্চাদের ভিতরেই অনেক সুপ্ত প্রতিভা থাকে। শুধু সেগুলো বের করে নিয়ে আসতে প্রয়োজন তাদের জন্য একটা সুষ্ঠু পরিবেশ।

-ঠিকই বলেছো। ছোট্টবেলা তোমার ও একটা প্রতিভা ছিল। বাসায় কেউ আসলেই তুমি তাদেরকে সেটা দেখাতে। জানো সেটা কি?

-কি বাবা?

সমরেশ বাবু বলার আগেই হাসতে লাগলেন।

-বাবা বলো না… কি ছিল?

-তুমি তোমার জ্বিহবাকে নাকে নিয়ে লাগাতে পারতে। (বলেই আবার জোরে জোরে হাসতে লাগলেন সমরেশ বাবু)

-চাঁদনী লজ্জা পেয়ে নিজেও হাসতে লাগল।

সমরেশ বাবু বললেনঃ

-দেখি তো চাঁদনী, এখন সেটা করতে পারো কি না? দেখাও তো।

চাঁদনী বাবার হাসি টা কে অমলিন রাখতে চেষ্টা করতে লাগল আর দুজনে একসাথে হাসতে লাগল।

 

————————

 

রোকসানার ফোন বাঁজছে। তিনি রান্নাঘরে। নাজনীন চলে যাওয়ার পর থেকে আর কোন ভাল কাজের লোক মিলছে না। বাসার সব কাজ তাকে একাই সামলাতে হয়।

কেয়া দৌড়িয়ে রান্নাঘরে গিয়ে আম্মুকে ফোনটা দিল; আম্মু, টিচার ফোন করেছেন।

রোকসানা বেগম ফোন ধরলেন।

-হ্যালো। স্লামুআলাইকুম ম্যাডাম। কেমন আছেন?

-নমষ্কার আপা। ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?

-জ্বি। আলহামদুলিল্লাহ।

-আপা আমি একটা কথা বলতে ফোন করেছি।

-জ্বি ম্যাডাম, বলুন।

-আমি আর টিউশনিতে আসতে পারব না আপা।

-সে কি? কেন ম্যাডাম?

চাঁদনী একটু আমতা আমতা করে;

-আপা, আমি তো আপনাকে বলেছিলাম ঘরে পুরুষ মানুষ থাকলে আমি বাসায় গিয়ে পড়াতে পারব না। আপনি তখন আমাকে আশ্বস্থ করেছিলেন যে আমি পড়ানোর সময় কোন পুরুষ থাকবে না বাসায়……

চাঁদনীর কথা শেষ করতে না দিয়ে রোকসানা বলে উঠলেন;

-না না ম্যাডাম, ওরকম কিচ্ছু হবে না। আসলে গতকাল কেয়া’র আব্বু চলেই যাচ্ছিলেন বাসা থেকে। ঐসময় টা তে উনি বাসায় কখনও থাকেন না কিন্তু কালকে ওনার একটু শরীর খারাপ লাগছিল। তাই যান নি।

-দেখুন আপা, হয়তো ওনার শরীর খারাপ লাগছিল কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে পড়ার রুমে……

রোকসানা আবারো চাঁদনীর কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন;

-আসলে উনি জানতেন না যে, কেয়া প্রাইভেট টিউশন নিচ্ছে। গতকালকে এটা জানার পর উনি কেয়া’র পড়ালেখার খোঁজ খবর জানার জন্য আপনার সাথে দেখা করতে পড়ার রুমে গিয়েছিলেন। বাবা হিসেবে নিজের মেয়ের পড়ার খবর তো একটু নিতেই হয় , তাই না ম্যাডাম? আপনি কোন চিন্তা করবেন না। উনি আর বাসায় থাকবেন না এভাবে।

-আপা আপনি না হয় কেয়া’কে আমার বাসায় নিয়ে আসেন। আমি পড়াবো।

– প্লিজ ম্যাডাম, আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। ওরকম কিছু হবে না আর।

-কিন্তু আপা…

-ম্যাডাম কেয়া আপনাকে খুব পছন্দ করে, খুব মিশে আপনার সাথে। আমি একদম সময় করে উঠতে পারব না তাকে আপনার বাসায় নিয়ে যাওয়ার। প্লিজ ময়াদাম, আপনি আসুন।

-আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন এভাবে তাহলে আসব।

-ধন্যবাদ ম্যাডাম। স্লামুআলাইকুম।

-নমষ্কার।

ফোনে কথা শেষ করেই হাতের কাজগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করতে লাগলেন রোকসানা। তাকে আজকে একটু বাবার বাসায় যেতে হবে। কিছুদিন ধরেই তার খুব অসুস্থ কেয়া’কে বাসায় রেখে যাবেন তার আব্বুর কাছে। আবার রাত্রে চলে আসবেন। বাবার বাড়ি কাছে হওয়ায় প্রায় সময় তিনি বাবার বাড়িতে এভাবে যান।

 

————————-

 

পাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে  যাচ্ছে চাঁদনী। গন্তব্য টিউশনি। রাস্তা দিয়ে হাটার সময় আশেপাশে সে তেমন একটা খেয়াল করে তাকায় না, সোজা হাঁটতে থাকে কিন্তু আজকে সে মনে মনে কাউকে খুঁজে যাচ্ছে। সেটা হল এই পাড়ারই দশ-এগারো বছরের একটা ছেলে। ছেলেটা প্রায় সময় চাঁদনী কে রাস্তায় টিজ করে। এতোটুকু একটা পিচ্চি ছেলে রাস্তায় তাকে দেখলেই “ও সুন্দরী… বিয়া করবানি?” বলে চেঁচায় আর হাসে!

বিষয় টা খুবই বিরক্তিকর এবং লজ্জাজনক! এইটুকু পিচ্চি ছেলের বিয়ের শখ জেগে গেছে! কি আশ্চর্য! এই ছেলেটা কে কি তার বাপ-মা কোন শিক্ষাই দেয় নি? অসভ্য-অভদ্র-অশিক্ষিতের দল। আজকে যদি ফের এরকম করে, তাহলে তাকে কষিয়ে দুটো চড় দিবে চাঁদনী। এই সিদ্ধান্ত নিয়েই সে ঘর থেকে বের হয়েছে আজ।

ছেলেটাকে পাওয়া ও গেল, আর বরাবরের মতো ছেলেটা “ও সুন্দরী… বিয়া করবানি?” বলে উত্যক্ত করতে লাগল চাঁদনীকে।

চাঁদনীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক খুব ইচ্ছা হচ্ছিল এখনই গিয়ে ধরে থাপ্পড় লাগাবে শয়তান টা কে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে উঠতে পারে নি। পরে যদি আরো বেশি করে তাকে জ্বালাতন করে! ছেলেটার অভিভাবক যদি কোন কিছু না বুঝেই চাঁদনীর সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়! এইরকম অনেক ভয়ের কথা চিন্তা করে চুপচাপ রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যায় সে। রিকশায় উঠে আবার ভাবতে থাকে- ছেলেটাকে হয়তো ছেড়ে দেয়া ঠিক হয়নি। এরকম প্রতিদিন বিরক্ত হতে ভাল লাগে না।  যা হবার হতো তবুও ছেলেটার একটা উচিৎ শিক্ষা হতো। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজটা করতে না পারায় নিজের উপরেই এখন নিজের খুব রাগ হচ্ছে তার।

 

বাসার কলিং বেল বাজার অনেকক্ষণ পরে রোকসানা এসে দরজা খুলে দিলেন। চাঁদনী রোকসানা কে “ভাল আছেন আপা?” বলেই কোন উত্তরের অপেক্ষা বা কুশল বিনিময়ের চেষ্টা না করে সোজা পড়ার রুমে চলে যায়।

কেয়া পড়ার টেবিলেই বসা। চাঁদনীকে দেখেই সালাম দিল সে।

-আসসালামুয়ালাইকুম টিচার।

-নমষ্কার মা মণি। কেমন আছো? কি করছো তুমি?

-ভাল আছি টিচার। ড্রয়িং করছিলাম। আমি আপনার জন্য একটি ছবি এঁকেছি।

-তাই নাকি? কি এঁকেছো দেখি তো…

কেয়া আর্ট পেপার টি চাঁদনীর দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু চাঁদনী নিচ্ছে না। চাঁদনী বলল;

-কেয়া কাউকে কিছু দিতে হলে, বাম হাত দিয়ে দিতে হয় না। দিতে হয় ডান হাত দিয়ে। তাতে উনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। তুমি এখন থেকে সবাইকে কিছু দিতে হলে ডান হাত দিয়ে দিবে। ঠিক আছে?

কেয়া হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়িয়ে সাথে সাথেই হাত বদল করে ডান হাত দিয়ে পেপারটি দিল চাঁদনী কে। চাঁদনী হাতে নিয়ে দেখল – এটি তাদেরই ছবি। ছবিটিতে চাঁদনী কেয়া’কে একটি লাল গোলাপ দিচ্ছে। ছবিটি কার্টুনের আদলে আঁকা।

কোন চেহারা ছবি না বুঝা গেলেও আঁকা দেখে সহজেই বুঝা যাচ্ছে যে, ছবির চরিত্রগুলো কাদের। কারণ- চরিত্রের নিচে ইংরেজীতে লিখা- টিচার, মি আর ফুলের নিচে লিখা রেড রোজ।

তবুও চাঁদনী কেয়া কে জিজ্ঞাসা করল;

-এটা কার ছবি এঁকেছো কেয়া?

-এটা আপনি আর এটা আমি (কেয়া আঙ্গুল দিয়ে দেখাল।)

চাঁদনী উৎফুল্লিত চেহারা নিয়ে;

-তাই নাকি? তুমি আমাদের ছবি এঁকেছো? বাহ!! খুব সুন্দর হয়েছে তো!

-থ্যাংক ইউ টিচার। (কেয়া খুব খুশি হয়ে।)

-তা আমার হাতে ফুল কেন?

-ফুল টা আপনি আমাকে দিচ্ছেন টিচার। রেড রোজ। রেড রোজ আমার খুব পছন্দের।

-তাই নাকি? ফুল কেন দিচ্ছি আমি তোমাকে?

-আমি বার্ষিক পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছি বলে।

-ও মা! তুমি তো দেখছি অনেক দূরদর্শী! মাত্র তো তোমার নতুন ক্লাস শুরু হল! আমি খুব প্রসন্ন হয়েছি কেয়া। ছবিটি আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি এটি বাসায় নিয়ে ফ্রেম করে রাখব ।

কেয়া খুব খুশি হল। টীচারের এতোগুলো প্রশংসা পেয়ে সে খুবই আনন্দিত।

চাঁদনীর ছবি টা খুব ভাল লাগলেও কেয়া’র একটি কথা তার ভাল লাগে নি। কেয়া জিপিএ ফাইভ এর কথাটি বলেছে বলে। কেয়া তার মনের ভিতরে জিপিএ ফাইভ টাকেই তার চুড়ান্ত সফলতা বলে ধারণ করে ফেলেছে। যা একদম ঠিক নয়। একজন ছাত্র/ছাত্রীর মেধা কখনও শুধুমাত্র তার গ্রেড পয়েন্ট দিয়ে বিচার করা যায় না। এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে সে তার  পড়ালেখার সফলতা মানে জিপিএ ফাইভ টা কেই বুঝছে! সে চিন্তা করছে, তার টিচার তাকে তার প্রিয় ফুল দিয়ে তখনই শুভেচ্ছা জানাবে, যখন সে জিপিএ ফাইভ পাবে! এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।

তার-ই বা দোষ কি? দোষ হচ্ছে এই সিস্টেমের, এই সমাজের, যারা মেধাকে  জিপিএ ফাইভ দ্বারা বিচার করে। তবে কেয়া’র মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে যে, জিপিএ ফাইভ পেয়ে পাশ না করলে ও তার টিচার তাকে রেড রোজ দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবে।

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ নাকে এসে তার। চাঁদনী সাথে সাথেই বুঝতে পারে যে, মোতাহার হোসেন ঘরেই আছেন কারণ- সে গতদিন ও এরকম সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিল।

চাঁদনী কেয়া কে জিজ্ঞেস করে;

-কেয়া, তোমার আব্বু কি বাসায়?

কেয়া বিরক্তি নিয়ে বলল

-হ্যাঁ বাসায়।

চাঁদনী একটা ব্যাপার নোটিস করেছে। সেটা হল- কেয়া তার বাবাকে খুব একটা পছন্দ করে না। তার আব্বুর কথা উঠলেই সে কেন জানি একটু বিরক্তিবোধ দেখায়! এই কারণে কেয়া’র কাছ থেকে তার আব্বু সম্পর্কে অনেক নেগেটিভ তথ্য জানতে পারার একটা সুযোগ আছে।

চাঁদনী আবার জিজ্ঞেস করল;

-সে কি! তিনি কাজে যান নি?

-দুপুরের দিকে গিয়েছিলেন একবার কই জানি, আবার ফিরে এসেছেন।

-কেন? ওনার কি শরীর খারাপ?

-নাহ। দুদিন ধরে এই সময় টা তে বাসায় চলে আসেন। ওনার জন্য আমি টিভি তে কার্টুন দেখতে পারি না। বাবা শুধুই রেসলিং দেখে।

রোকসানা চাঁদনীকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টিউশনি তে আবার নিয়ে এসেছেন এটা চাঁদনী কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ওনার স্বামী সেদিনের পর থেকে এই সময় টা তে ঘরেই থাকছেন এটা মোটেও ভাল লক্ষণ নয়। সে রোকসানা কে জিজ্ঞেস করতে চায়- কেন তিনি এমন করলেন? তাই সে এদিল ওদিক তাকিয়ে  কেয়া কে জিজ্ঞেস করল;

-কেয়া, তোমার আম্মু কোথায়?

-আম্মু মনে হয় ঘুমাচ্ছেন।

চাঁদনী কিছুটা অবাক হয়ে;

-কি ব্যাপার? এখন ঘুমাচ্ছেন কেন তিনি? এই সময় টা তে তো ওনাকে আমি কখনও ঘুমাতে দেখিনি!

-কাল রাত আম্মু নানু বাড়ীতে ছিলেন। নানু অসুস্থ। তাই আম্মু সারা রাত ঘুমাতে পারেন নি। দুপুরে ফিরেছেন। আপনি আসার আগেও আম্মু ঘুমে ছিলেন।

-ও মা! তাই নাকি? কি হয়েছে তোমার নানুর?

-জানি না। আম্মু আমাকে নিয়ে যায় নি।

-সে কি! তুমি কাল সারা রাত তোমার আম্মুকে ছাড়া একা বাসায় থেকেছো?

-হ্যাঁ। আব্বু ও ছিল। আমরা দুজন ছিলাম। দুপুরে আম্মু বাসায় আসার পর আব্বু বাইরে গিয়েছিল।

-ওহহো!

-টিচার, আমি কি দেখে আসব আম্মু কি করছে?

-না না… থাক। লাগবে না।

চাঁদনী ভাবল- আহা রে! বেচারী রোকসানা আপার বাবা অসুস্থ, সারা রাত কতোই না কষ্ট করেছে, ঘুমাতেও পারে নি। সবকিছু গোলমেলে হয়ে আছে। এমন সময় পাশে থাকার জন্য ও তো অন্তত ওনার স্বামীর বাসায় থাকা টা প্রয়োজন। হয়তো এজন্যই কেয়ার আব্বু বাসাতে থেকেছেন। বেচারীকে ভুল বুঝা টা ঠিক হয় নি।

চাঁদনী আর কথা না বাড়িয়ে কেয়া কে পড়াতে শুরু করল। ইংরেজী গ্রামার বই। বিষয়- ল্যাংগুয়েজ।

এমন সময় মোতাহার হোসেন পড়ার রুমের পাশ দিয়ে একটা হিন্দী গান গাইতে গাইতে হেঁটে গেলেন। গানটি ছিল- ‘খোদা ভি যাব তোমহে মেরে পাস দেখতা হোগা, ইতনি আনমোল চিজ দে দি ক্যায়সে? সোচতা হোগা।“

চাঁদনী গান শুনে হঠাৎ একটু ভয় পেয়ে গেলেও কেয়া’র একটা কথায় সে হো হো করে হেসে উঠল।

কেয়া বলছিল- আব্বু শুধু ইংরেজী গান গায়।

চাঁদনী হাসতে হাসতেই বলল;

ওটা ইংরেজী গান নয় কেয়া। ওটা হিন্দী গান। ইংরেজী হল যেটা তুমি এখন পড়ছো, আর হিন্দী হল ভারতের রাষ্ট্র ভাষা। তুমি টিভিতে ছোটা ভীম কার্টুন দেখো?

-হ্যাঁ দেখি তো। আমার খুব প্রিয়! ছোটা ভীম লাড্ডু খেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়।

-হ্যাঁ। ঐটাতে ছোটা ভীম যে ভাষায় কথা বলে সেটা হচ্ছে হিন্দী ভাষা।

কেয়া মনে হয় একটু লজ্জা পেয়েছে। সে জ্বিহবা বের করে কেমন জানি একটা লাজুক হাসি দিল।

চাঁদনীর চোখে ভেসে উঠল টিউশনির প্রথম দিনের সেই কেয়া। প্রথম দিনের সেই লাজুক কেয়া এতো অল্প সময়ে আজ তার সাথে কতো মিশে গেছে! চাঁদনীর কাছে ও কেয়া কতো আপন হয়ে গেছে!

এই ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রতি চাঁদনীর কতো যে দূর্বলতা সেটা সে কাউকে বুঝাতে পারবে না।

-কেয়া, তোমার আম্মুকে ছাড়া থাকতে তোমার কষ্ট হয় না? ভয় পাও না?

-হ্যাঁ। আম্মুকে ছাড়া আমি ভয় পাই। গতকাল রাতে ও ভয় পেয়েছি।

-কেন? ভয় পেলে কেন?

-গতকাল রাতে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ কান্নার শব্দে, ভয়ে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিলাম আমি।

-কান্নার শব্দে? কার কান্না?

-নাজুনীর!

-নাজুনী মানে? নাজনীন? যে তোমাদের বাসায় থাকতো?

-হ্যাঁ।

-কি বলো? উনি তো বিদেশে থাকে। এখানে আসবেন কি করে?

-সেটা জানি না। তবে এসেছিলেন। তার কোলে একটা বেবি ও ছিল। আমি বেবি টা কে আদর করতে পারি নি।

-কেন? তুমি যাও নি তাদের কাছে?

-না। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি নাজুনী কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছে। আমি নাজুনী’কে আমার জন্য লাল আলোর জোনাকী নিয়ে আসার কথাটাও বলতে পারি নি।

চাঁদনী একদম হতভম্বের মতো কেয়ার কথা শুনছে। কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না!

কেয়া বলতে থাকল- আব্বু বলে আমি নাকি এসব স্বপ্নে দেখেছি! কিন্তু টিচার আমি স্বপ্ন দেখি নি। আব্বু আমাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। আমার মনে আছে।

-তুমি তোমার আম্মুকে বলেছো এসব?

কেয়া মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করে বলল;

-হ্যাঁ বলেছিলাম। এটা নিয়ে আম্মু আব্বুর সাথে অনেক ঝগড়া করেছে। আব্বু আম্মুকে ও বলেছে যে, আমি স্বপ্নে দেখেছি।

চাঁদনী কোন কথা বলছে না। দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে বসে আছে। চাঁদনী ভাবতে লাগল- একটা টিউশনিতে এসে এতো রহস্য! কি ঘটছে এসব? কেয়া’র দেখা যদি বাস্তব হয় তাহলে কেয়ার আব্বুর চরিত্র যে কতোখানি খারাপ সেটা চিন্তার বাইরে। আর যদি স্বপ্নই হয় তাহলে কেয়া ঠিক স্বপ্নটাই দেখেছে তার আব্বু কে নিয়ে।

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে পড়ার রুমে এসে ঢুকলেন মোতাহার হোসেন। চাঁদনীর তো সাথে সাথেই মেজাজ গরম হয়ে গেল। কিন্তু সে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।

মোতাহার হোসেন তার মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন;

-“বুঝেছিস কেয়া, আমি বাসায় থাকলে তোর ম্যডামের নাকি পড়াতে অসুবিধা হয়!”

বলেই পড়ার টেবিলের পাশে থাকা সোফায় বসে পড়লেন।

মোতাহার হোসেনের কথায় চাঁদনী ও কেয়া দুজনকেই খুব বিরক্ত দেখালো। দুজনের-ই ভ্রু কুঁচ করা। তারা মোতাহারের কথা শুনেও না শুনার ভান ধরে ব্যাস্ত থাকল। কেয়া পড়া নিয়ে ব্যাস্ত আর চাঁদনী কলম হাতে নিয়ে কাগজে অযথাই আঁকাবুকি করে ভাবতে লাগল- এই বজ্জাত লোকটা আবারও এই রুমে এসেছে! বিরক্ত তো করছেই আবার এখানে এসে সেটা বলতে ও লজ্জা লাগছে না! নিশ্চই রুকসানা আপা তাকে এই বিষয়ে সাবধান করেছেন কিন্তু তবুও লোকটা এতো বেহায়া যে আজ আবার পড়ার রুমে এসেছে তা ও সোফায় এসে বসে রয়েছে!

চাঁদনী খেয়াল করল মোতাহার সোফায় বসে তার দিকে তাকিয়েই আছে। তার তাকানোতে লোভী একটা ভাব। খুব খারাপ একটা চাহনী!

সে কি করবে বুঝতে পারছে না। তার বিরক্তি এখন ভয়ে পরিণত হতে শুরু করেছে। ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে রুকসানা আপাকে ডাক দিতে কিন্তু সে পারছে না।

ঐ সময় মোতাহার সোফা থেকে উঠে পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাড়ালে চাঁদনীর ভয়টা আরো বেড়ে গেল। এবারে সে মোতাহারের দিকে না তাকিয়ে পারল না। মোতাহার বলল;

-আপনার কি পাসপোর্ট আছে?

চাঁদনী হতবাক হয়ে;

-আমাকে বলছেন?

-জ্বি। পাসপোর্ট আছে আপনার?

কেন পাসপোর্টের কথা জিজ্ঞেস করা হল সেটা জানার ইচ্ছা থাকলেও চাঁদনী কথা বাড়াল না।

মোতাহার এবার খুব গম্ভীর গলায় বলল;

-পাসপোর্ট তৈরি করুন। টাকা যা লাগবে আমি দেব। আপনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ এ যাবেন। আমি আপনাকে বিদেশ পাঠাব। আপনি সেখানে পড়ালেখা করবেন।

মোতাহারের কথাবার্তা শুনে চাঁদনীর হাত-পাঁ ঠান্ডা হয়ে কাঁপতে শুরু করল। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল;

-কেন? আপনি আমাকে বিদেশ পাঠাবেন কেন?

-আপনাকে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি আপনাকে বিয়ে করব।

এই কথা শুনার পর চাঁদনী চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়ে পরল।

-আপনি কি বলছেন এসব? আমি ওরকম মেয়ে নই।

-ওরকম নন বলেই তো বললাম আমি আপনাকে বিয়ে করব। বিদেশে পাঠাব। আপনি ভাল ছাত্রী। বাইরে ভাল ভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা আপনার অবশ্যই আছে। আমি সে ইচ্ছা পূরণ করব। আমাদের বিষয়ে কেউ কিচ্ছু জানবে না।

এসব বলতে বলতে মোতাহার চাঁদনীর দিকে লোভী চেহারা নিয়ে এগোতে লাগল।

চাঁদনী চোখে অন্ধকার দেখছে। সে আর কোনভাবেই নিজেকে সামলাতে না পেরে এক দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় চলে যায়।

আর কেয়া তখন ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে!

মোবাইলে রিং হচ্ছে বারবার। সমরেশ বাবু মোবাইল হাতে মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে গেলেন।

-চাঁদনী তুমি এখানে? তোমাকে খুঁজছিলাম। তোমার ফোন বাঁজছে অনেকক্ষণ থেকে।

ফোন করেছেন রুকসানা বেগম। চাঁদনী ফোন হাতে নিয়ে দেখল সাতটা মিসকল।

-আচ্ছা বাবা তুমি যাও।

সমরেশ বাবু মেয়ের সাথে একটা ব্যাপারে কথা বলতে চান কিন্তু কিভাবে শুরু করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তখন তার চোখে পরল চাঁদনীর হাতে একটা ছবি। তিনি ওটা দিয়েই শুরু করলেন।

-তোমার হাতে ওটা কিসের ছবি?

চাঁদনী কথা না বলে ছবি টা বাবার দিকে এগিয়ে দিল। সমরেশ বাবু হাতে নিয়ে দেখলেন।

-আরে এটা তো একটা ড্রয়িং! অত্যন্ত সুন্দর। কে এঁকেছে?

-আমার টিউশনির ছাত্রী টা।

-বাহ! খুব সুন্দর হয়েছে। সে তোমাকে ছবি এঁকে উপহার দিয়েছে?

-হুমম।

-মেয়েটা খুব ভাল মনে হচ্ছে। তোমার টিউশনি তো তাহলে ভালোই যাচ্ছে তাই না?

চাঁদনী কোন উত্তর না দিয়ে বাবাকে একটু হাসি মুখ দেখাল।

সমরেশ বাবু এই সুযোগে খুশি চেহারা নিয়ে বললেন;

-একটা কথা বলার ছিল মা।

-হুমম। বলো বাবা।

-একটা ভাল সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে জার্মানে থাকে। খুব ভাল সম্বন্ধ। বিদেশে পড়ালেখা করে ওখানেই স্যাটেল।

বিদেশের কথা শুনেই চাঁদনীর কলিজা শুকিয়ে গেল! বুকটা কেমন জানি কেঁপে উঠল! সে কোনমতে নিজেকে সামলে বাবাকে বলল;

-পরে কথা বলব বাবা। তুমি ঘরে যাও।

সমরেশ বাবু আনন্দের সাথে চলে গেলেন।

তলপেটের ব্যাথা টা বেড়েছে। সকাল থেকে পিরিয়ডের ব্যাথাটা যন্ত্রণা দিচ্ছে। গায়ে রোদ লাগাতে আজ ছাদে এসে দাড়িয়ে রয়েছে চাঁদনী। ছাদে আসার আরেকটি কারণ আছে। তাদের ছাদ থেকে অনেক দূরে ভারতের মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় দেখা যায়। সবসময় নয়। আঁকাশ পরিষ্কার থাকলে। মেঘ থাকলে স্পষ্ট দৃশ্যমান হয় না। আজ আকাশ পরিষ্কার। অনেক দূরের পাহাড় আজ খুব কাছে মনে হচ্ছে। চাঁদনী দাবি করে এই পাহাড় টা নাকি তার। বান্ধবীদের কাছে তার এই পাহাড়ের গল্প সে কতোবার করেছে!

যখনই মন খারাপ হয় চাঁদনী ছাদে এসে দূর সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে গুনগুনিয়ে কথা বলতে থাকে। পাহাড়ের সাথে সে তার দুঃখ গুলো ভাগাভাগি করে নেয়। এজন্যই আজ তার ছাদে আসা।

আবার ফোন করেছেন রোকসানা। তিন-চার বার ফোন বাজার পর রিসিভ করল চাঁদনী। রিসিভ করে কোন কথা না বলে চুপ করে আছে। ওপাশ থেকে রোকসানা বারবার হ্যালো হ্যালো বলছেন। এভাবে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর কথা বলল চাঁদনী।

-হ্যাঁ বলুন।

রোকসানা একটা আতংকের স্বরে তাড়াহুড়া করে বললেন;

-ম্যাডাম কেমন আছেন? অনেকক্ষণ যাবৎ আপনাকে ফোন দিচ্ছিলাম।

চাঁদনী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনবার বলল;

-ভাল…….ভাল……..ভাল……………

-ম্যাডাম আপনি কেয়া কে পড়াতে আসছেন না যে?

-আমি আসব? আসব বলছেন আপনি?

-কেন? আসবেন না?

-না। আসব না। এতোকিছুর পরে আপনি কিভাবে এই কথা বলছেন আমার তো এইটা কোনভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না!

-ম্যাডাম আমি সব শুনেছি। কেয়া আমাকে সব বলেছে।

চাঁদনী তার হাতের ছবিটার দিকে তাকিয়ে আবারও দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল;

-কেয়াহহহহহহহ….. কেমন আছে সে?

-ভাল না ম্যাডাম। সেদিনের পর থেকে কেয়ার খুব জ্বর। অনেকবার আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছে। আপনার ধরে চিৎকার করে কাঁদে! আমার ভয় হচ্ছে ম্যাডাম। ওর বাবার কু-চরিত্রের ফল আমার মেয়েটাকে না ভোগতে হয়।

বলেই কাঁদতে লাগলেন রোকসানা। কান্নাস্বরে বললেন;

-কেয়া তার বাবাকে একদম সহ্য করতে পারে না। নাজনীন এর ব্যাপার টা ও সে আঁচ করতে পেরেছিল। আমি জানি আমার মেয়ে কখনও মিথ্যা বলে না। নাজনীন কে সে খুব ভালবাসতো। নাজনীন চলে যাওয়ার পর থেকে, কেয়া একদম একাকী হয়ে গিয়েছিল। তাকে হাসতে ও দেখা যেতো খুব কম। আপনি আসার পর থেকে আমি আবার আমার সেই আগের মেয়েটা কে ফিরে পেয়েছিলাম কিন্তু এই কুৎসিত মনের লোকটার জন্য….. ( বাকিটুকু না বলে আরো জোরে কাঁদছেন রোকসানা) শুধু মেয়েটার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে লোকটাকে সহ্য করি ম্যাডাম। বুঝেন-ই তো, স্বামী সংসার তো একবার-ই হয়। হ্যালো….. হ্যালো…..

-হ্যাঁ বলুন আপা। আমি শুনছি।

-ম্যাডাম আপনি অন্তত একবার এসে আপনার বেতনের টাকা টা নিয়ে যান আর আমার মেয়েটার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে তার সাথে কথা বলে যান।  প্লিজ ম্যাডাম…

চাঁদনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল;

-আমি আর কোনভাবেই আপনাদের বাসায় যেতে পারব না আপা। আপনি বরং আমার বেতনের টাকা টা কেয়ার চিকিৎসার কাজে লাগান। তাতে আমি অনেক খুশি হব।

-রোকসানা কোন কথা বলছেন না। শুধু কান্নার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে।

চাঁদনী আর কোন কথা না বলে ফোন কেটে দিল। কেয়া’র আঁকা ছবি টি বুকে জড়িয়ে ধরে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে গুনগুনিয়ে বলল— ও পাহাড়, চাঁদনীকে “রেড রোজ” দেয়া হল না।

_______________<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>_______________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here